রাহাদ সুমন,বরিশাল ::
সাগরকন্যা কুয়াকাটা বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত, যেখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই উপভোগ করা যায়। দিনের বেলায় নীল সমুদ্র, মৃদু ঢেউ আর পাখির কলতানে মুগ্ধ হয় পর্যটকেরা। তবে সূর্য যখন ধীরে ধীরে দিগন্তে হারিয়ে যায়, তখনই যেন কুয়াকাটা খুলে দেয় তার আরেকটি রূপ রাতের আলোয় জেগে ওঠা ফিশ ফ্রাই মার্কেট, যা এখন পর্যটন, স্বাদ আর স্থানীয় অর্থনীতির এক অনন্য মিলনস্থল।
গোধূলির লাল আভা মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের জিরো পয়েন্ট ও আশপাশের এলাকায় শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। সারি সারি দোকানে সাজানো হয় টাটকা সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, অক্টোপাসসহ নানা বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক প্রাণী। ঝলমলে আলো, কোলাহল আর মানুষের ভিড়ে মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় পুরো মার্কেট এলাকা।
সমুদ্রের ঢেউয়ের মৃদু শব্দের সঙ্গে যখন মিশে যায় গরম তেলে মাছ ভাজার সোঁদা গন্ধ ও বারবিকিউর ধোঁয়া, তখন পুরো পরিবেশ যেন এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করে। পর্যটকেরা হাঁটতে হাঁটতে পছন্দের মাছ বেছে নেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তা গরম গরম ফ্রাই বা বারবিকিউ হয়ে পরিবেশিত হয়।
এই মার্কেটের অন্যতম আকর্ষণ এর বৈচিত্র্য। এখানে টুনা, কোরাল, পোয়া, লইট্টা, বগনি, মাইট্যা, তাইড়্যা, ভোল, রূপসা, লাক্কা, রূপচাঁদা, ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এছাড়া রয়েছে চিংড়ি, কাঁকড়া, স্কুইড, অক্টোপাস এবং আরও কিছু অচেনা সামুদ্রিক প্রাণী।
দামের দিক থেকেও রয়েছে বৈচিত্র্য: চিংড়ি ৫০ থেকে ৫০০ টাকা, কাঁকড়া ৫০ থেকে ১৫০ টাকা, টুনা ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা, রূপচাঁদা ১০০ থেকে ৫০০ টাকা, স্যালমন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, কোরাল ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। মৌসুমভেদে এসব দামে কিছুটা ওঠানামা হয়।
পর্যটকদের জন্য এই মার্কেট শুধু খাবারের জায়গা নয়, এটি এক অভিজ্ঞতার নাম। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বসে সমুদ্রের বাতাসে গরম গরম মাছ খাওয়া এই অভিজ্ঞতা তাদের মনে দাগ কেটে যায়। এই মার্কেটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক । স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন খাত সবখানেই এর প্রভাব পড়ছে। পর্যটকদের আগমনে হোটেল বুকিং বাড়ছে, খাবারের বিক্রি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। অনেকেই ছোট ব্যবসা শুরু করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক বলেন,কুয়াকাটায় এসে ফিশ ফ্রাই না খেলে মনে হয় ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এখানে পরিবারের সবাই নিজের পছন্দমতো মাছ খেতে পারে এটা সত্যিই দারুণ ।নারী, পুরুষ ও শিশুদের পদচারণায় মুখর থাকে পুরো এলাকা।
কুড়িগ্রাম থেকে আসা আব্দুল কাদের বলেন, আমি আজ টুনা মাছ খাচ্ছি। এখানকার পরিবেশ, খাবার সবকিছুই খুব ভালো লেগেছে। ছুটির দিনে এখানে হাজার হাজার পর্যটক আসে। পরিবেশটা খুবই প্রাণবন্ত।
ফিশ ফ্রাই মার্কেট এখন কেবল পর্যটকদের আকর্ষণ নয়, এটি স্থানীয় মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস। ফ্রাই দোকানি জামাল হোসেন বলেন, পর্যটকদের ভিড় বাড়ায় আমরা এখন অনেক খুশি। আমরা চেষ্টা করি ভালো মানের মাছ দিতে। সমুদ্রে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় এখন মাছের সরবরাহ বাড়ছে। কিছুদিন পর দামও কমে আসবে।
ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম বাচ্চু জানান,ফিশ ফ্রাই মার্কেট কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখছে।
মার্কেটটিতে ৫০টিরও বেশি দোকান রয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই এখানে পর্যটকদের ভিড় বাড়তে থাকে।